বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৬

আর নয় বেকারত্বের অভিশাপ, প্যানেল প্রবর্তনে বেকারত্ব মুক্তিপাক: আরফান চৌধুরী আরাফ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংকট নিরসনে নেওয়া হচ্ছে না কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ। আস্তে আস্তে ভেঙ্গে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। এই ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থার পিছনে দায়ী কে ? প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অবক্ষয়ের পিছনে যদি কাউকে দায়ী করা হয় নি:সন্দেহে আঙ্গুল উঠবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপর। তাদের অদক্ষতা,অব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী চিন্তার অভাবে আজ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, অবহেলিত ।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অদক্ষতা,অব্যবস্থাপনা ও খামখেয়ালিপনার চিত্র ফুটে উঠেছে তাদের পেশাদারিত্বের মধ্যেও। করোনাভাইরাসের প্রকোপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি অফিস ও আদালত ছুটির মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়। সরকারি আদেশ প্রতিপালনে গত ৯ এপ্রিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের অধীনস্থ জেলা শিক্ষা অফিসার ও প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সুপারিনটেনডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে অবস্থান না করে অন্যত্র অবস্থান করছেন, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর পরিপন্থী। সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও কেউ কেউ অবহেলা করেছেন, দায়িত্ব ফাঁকি দিয়েছেন। অভিযোগ ওঠার পর প্রথমে কারা কর্মস্থলে নেই বা কাজে অবহেলা করেছেন তাদের তালিকা চায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। উপযুক্ত ও দক্ষ জনবলের অভাব, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ কিছু কর্মকর্তাদের কারণে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কার্যক্রম আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৪ ( বৃহস্পতিবার) এপ্রিল, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯ প্রণয়ন করেন। নতুন এই বিধিমালাতে ৫ টি পরিবর্তন এনে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। উক্ত বিধিমালার ৮ নং এর (ঘ) এর উপবিধি ২ (গ) এ উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ধারিত কোটার শিক্ষকগনের মধ্যে প্রত্যেক ক্যাটাগরিতে (মহিলা ৬০%,পোষ্য ২০%, অবশিষ্ট পুরুষ ২০%) অবশ্যই ২০% বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রিধারী প্রার্থীগনের নিয়োগ নিশ্চিত করিতে হইবে। তাহলে যারা ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগ থেকে এতগুলো বছর পড়াশোনা করে এসেছে তাদের কি মূল্য দেওয়া হলো? নাকি প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়ার মত তাদের কোনো যোগ্যতা নেই? প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরনে চরম হতাশা ও তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থী ও দেশের সচেতন সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮% হলেও এই শিশুরা কতোটা মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬৫% শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারেনা। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা তার চাইতেও বেশি। কিছু বাচ্চা অক্ষরই চিনে না। সরকারি নিয়মানুযায়ী শিশুদের বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে ভর্তি করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ওই শ্রেণীতে পরার দক্ষতা শিশুটির নেই। হয়তো বয়স দেখে একটা বাচ্চাকে ক্লাসে ভর্তি করানো হয় কিন্তু পরে দেখা যায় যে তারা বাংলা ইংরেজি রিডিং পড়তে পারেনা। কিছু বাচ্চা অক্ষরই চিনেনা।

এর একটি অন্যতম প্রধান কারণ বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে পরিমাণ শিক্ষার্থী রয়েছে তার বিপরীতে শিক্ষক রয়েছে খুবই নগন্য।তাই সব শিক্ষার্থীদের প্রতি আলাদাভাবে নজর দেয়া রীতিমত অসম্ভব।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৮ সর্বোচ্চ সংখ্যক ২৪ লক্ষ পরীক্ষার্থী আবেদন করেন যার মধ্যে থেকে আমরা ৫৫,২৯৫ জন(২.৩%) পরীক্ষার্থী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় ।অধিক পরিমাণে শূন্যপদ থাকার সত্ত্বেও ৫৫,২৯৫ জন থেকে মাত্র ১৮১৪৭ জন পরীক্ষার্থীকে চূড়ান্ত ভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। বাকি ৩৭ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী নিয়োগ বঞ্চিত হয় অথচ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো: ফসিউল্লাহ স্যার বলেছেন, ভাইভাতে কোনো পাশ/ফেল নেই। উপস্থিত হলেই ১৪/১৫ নম্বর পাওয়া যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, প্রাথমিকে ভাইভা পরীক্ষায় ফেল বলতে কিছুই নেই। তাহলে বাকি ৩৭ পরীক্ষার্থীদের কেন চূড়ান্ত ভাবে সুপারিশ করা হলো না? এটা কি তাদের সাথে প্রহশন নয় কি?

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা ও রিট জটিলতার কারণে ৬ বছর পর ১ টি মাত্র নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়া, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ৮ নং এ শূন্যপদের ভিত্তিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক নিয়োগের কথা সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করার পরও শূন্যপদ খালি রেখেই নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা এটি কি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষার অধিদপ্তরের অদক্ষতার পরিচয় নয় কি? । ৬ বছরে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পাওয়ায় অনেক পরীক্ষার্থীর চাকরিতে প্রবেশের বয়স শেষ হয়ে গিয়েছে। প্রাথমিকের শিক্ষক হওয়ার যে স্বপ্ন দেখে তারা বড় হয়েছিল সে স্বপ্নটা চোখের সামনেই দম টেনে মরল। এই অপূরনীয় ক্ষতির পিছনে কে দায়ী? আজ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অবহেলার কারণে ৩৭ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে। তাই সময় এসেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, দূরদর্শী চিন্তা, উপযুক্ত ও কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণের।

৩৭ হাজার মেধাবী নিয়োগ বঞ্চিত পরীক্ষার্থী তাদের ক্ষতি পূরন চায়। তারা মনে করেন, যদি প্রাথমিকে প্যানেল পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে তারা তাদের অপূরনীয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠবে এবং একই সাথে চরম বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে । জাতির ভবিষ্যৎ কান্ডারী গঠনে ৩৭ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলেও তারা জানিয়েছেন।

  • আরফান চৌধুরী আরাফ 
  • এমবিএ ব্যাচ ১৫
  • চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments