সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২২

করোনাভাইরাসে বেড়েছে ধর্ষণ প্রবনতা

সারাক্ষন ডেস্কঃ মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর সাধারণ সময়ের তুলনায় বাংলাদেশে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি সংস্থা ও পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমনটি জানা যায়। মহামারী শুরুর পর গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে বিভিন্ন বয়সী নারী ও কন্যা শিশুর ওপর ধর্ষণের মতো নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় খুব বেশি। উদ্বেগজনক যে এ সময়ে প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর তুলনায় কন্যা শিশুদের ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটেছে। একক ধর্ষণের সঙ্গে ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাও। আবার ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যাও করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যাও করেছে। মহামারীর সময়ে বেপরোয়া এই ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ই এ জন্য দায়ী। তাদের মতে, দুষ্টচক্রের রাহুগ্রাস সর্বোচ্চ বেড়ে যাওয়ার জন্য অপরাধীরা বেপরোয়া অবস্থান নিয়েছে। সারা দেশে হঠাৎ করে ধর্ষকদের এই বেপরোয়া আচরণের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, দুর্বল ব্যক্তিত্ব ও হতাশাগ্রস্ত মানুষ এবং ক্ষমতার কারণে অহংকারী ব্যক্তিরা ধর্ষণের মতো অপকর্ম ঘটাচ্ছে। আবার সমাজে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতাও ধর্ষণের ঘটনা উসকে দিচ্ছে। মূলত মহামারীতে জবাবদিহিতা কম থাকার কারণে ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ১৩টি। এ সময় মোট ২২৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। আর ধর্ষণের জন্য আত্মহত্যা করেন ১০ জন। অন্যদিকে ২০২০ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ১ হাজার ৬২৭টি। এ সময় মোট ৩২৬ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। আর ধর্ষণের জন্য আত্মহত্যা করে ১৪ জন। অর্থাৎ ২০১৯ সালের চেয়ে বিদায়ী বছরে মহামারী চলাকালেও ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা আর এজন্য আত্মহত্যা করার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী ও শিশুর ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় চিন্তিত পুলিশ বাহিনীও। পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত বছরের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের মামলা হয় সাড়ে ৪ হাজার। অথচ এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩৩১টি। এ ছাড়াও করোনা সংক্রমণের এই সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বাইরে ঢাকা রেঞ্জের ১৭ জেলায় ৭৪৪টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। আর ডিএমপি এলাকায় হয়েছে ৩৭২টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনা মানুষকে কোণঠাসা করে ফেলছে, মানুষের এজন্য কোনো বিনোদন নেই, কোনো সামাজিক জীবন নেই, সামাজিক সম্পর্কগুলো ভেঙে দিচ্ছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলছে। আর এই সবকিছুই অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, কোণঠাসা করে রাখা, মানুষের মুখ বন্ধ করে দেওয়া পুঁজিবাদের মধ্যেই আছে। এ সমস্ত জায়গা থেকে আমরা সারা বিশ্বে পুঁজিবাদের চরম অধঃপতন দেখছি। বিশেষ করে বাংলাদেশে দুই ক্ষেত্রে এই অধঃপতন দেখছি। একটি দেখছি ধর্ষণের ক্ষেত্রে আরেকটি দুর্নীতিতে। ধর্ষণ আর দুর্নীতি কিন্তু আলাদা নয়। দুটিই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অংশ। মনোচিকিৎসক অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, পর্নোগ্রাফির বিভিন্ন ওয়েবসাইট ধর্ষণের মতো অপরাধ আরও উসকে দিচ্ছে। এই সাইটগুলো মানুষের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ এবং বিবেকবোধ শেষ করে দিচ্ছে। যারা পর্নোগ্রাফির জগতে ঢুকে পড়ে তাদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়। এতে ধর্ষকরা একজন নারীকে দেখামাত্রই তাকে ‘ভোগ্যপণ্য’ বলে মনে করে। আর যারা সংঘবদ্ধ হয়ে ধর্ষণ করে তাদের মধ্যে শক্তি ও আধিপত্যের উৎস থাকে। এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত জৈবিক তাড়নার কারণেই সাধারণত ধর্ষকরা এমন জঘন্য অপরাধ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক রাশেদা ইশরাদ নাসির বলেন, মহামারীর কারণে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে এসব শিক্ষার্থী আগের তুলনায় বাড়তি সময় পাচ্ছে। আর এই সময়টিকে অনেকে ভালো কাজে লাগাতে পারছে না। যার দরুন ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। করোনার সময়ে কিশোর ও তরুণদের ভালো সময় কাটানোর জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাড়ছে। ফলে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধগুলোও বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, করোনা মহামারীতে চলাচলের শিথিলতার কারণে অনেক ধর্ষণ মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। মহামারীতে জবাবদিহিতা কম থাকায় ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments